in

ডিজিটাল মার্কেটিং: আধুনিক যুগের প্রসার মাধ্যম

প্রাচীন যুগে আরব বা ভারতীয়রা ব্যবসা-বাণিজ্য করত, তা ছিল স্থল ও জলপথ নির্ভর। আরবদের বাণিজ্য বহরকে কাফেলা বলা হতো। এ সময় পণ্য মানুষের কাছে বিক্রি করার জন্য তেমন প্রচার-প্রসারণা করতে হতো না। অপরদিকে মধ্যযুগে বাণিজ্য করার নামে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বিভিন্ন অনুন্নত অঞ্চলকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছিল। আসলে ইউরোপীয়দের বাণিজ্য ছিল সাম্রাজ্যস্থাপনের প্রথম পদক্ষেপ। যদিও এখন আর কেউ সরাসরি হামলা করে দেশ দখল করে না বরং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে এটি চলছে।

Source: VMSL

বর্তমান যুগ ইন্টারনেট নির্ভর ও আধুনিক। একবিংশ শতাব্দীতে এসে একে ডিজিটাল যুগ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। ডিজিটাল যুগে ব্যবসা বাণিজ্যের ধরন পাল্টে ডিজিটাল হয়েছে সাথে যুক্ত হয়েছে অজস্র ব্যবসায়িক প্রতিযোগী। আর এই প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে প্রচার-প্রসারণার মাধ্যমে কীভাবে আপনার পণ্য সঠিক ক্রেতার কাছে পৌঁছবে, সেদিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। আর এই ডিজিটাল প্রচার-প্রসারণাই ডিজিটাল মার্কেটিং নামে পরিচিত।  

ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন প্লাটফর্মে বিক্রয়যোগ্য পণ্যের প্রচার করাকেই ডিজিটাল মার্কেটিং বলা হয়ে থাকে। যেমন-সার্চ ইঞ্জিন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল মার্কেটিং।

যে কারণে  প্রয়োজন ডিজিটাল মার্কেটিং

আমরা দৈনন্দিন কেউ অল্পসল্প আবার কেউবা অধিকাংশ সময় ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ায় ব্যয় করি। ভাল না লাগলে ফেসবুকিং করি কেউবা আবার ব্লগে লেখালেখি। স্ন্যাপচ্যাট বা ইনস্টাগ্রামে ছবি আপলোডেও অনেকের জুড়ি মেলা ভার। যেহেতু মানুষ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে, তাই ব্যবসা-বানিজ্যকেও সময়ের চাহিদায় প্রযুক্তিনির্ভর হতে হয়। এ কারণেই প্রয়োজন ডিজিটাল মার্কেটিং।

যে ৯ ধরনের ডিজিটাল মার্কেটিং আপনার ব্যবসা বাণিজ্যকে ক্রেতা সাধারণের হাতে পৌঁছে দিতে সক্ষম-

সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (SEO)

ধরে নিই আপনার হাতঘড়ির ব্যবসা আছে। একই সাথে এর জন্য একটি ওয়েবসাইট আছে। এখন যার হাতঘড়ি প্রয়োজন সে হয়ত গুগল বা ইয়াহুতে ঢুকে সার্চ দিল “লেটেস্ট হাত ঘড়ি” কিংবা “বেস্ট মেন্স হাত ঘড়ি”। মার্কেটিং এর ভাষায় এগুলোকে কি-ওয়ার্ড বলে। গুগল এই সার্চের ভিত্তিতে কিছু পণ্য সার্চকৃত ব্যক্তিকে দেখাবে এটাই সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন বা (এসইও)। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আপনার পণ্য ক্রেতার সামনে তুলে ধরতে কিছু কি-ওয়ার্ড বা কনটেন্ট নিয়ে কাজ করতে হবে। যাতে করে ক্রেতা সার্চ দেয়ামাত্রই আপনার পণ্যটি ক্রেতাকে সার্চ ইঞ্জিন দেখাতে বাধ্য হয়।  

Source: Time

সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটিং

স্বল্প খরচে মার্কেটিং বা প্রচারণার জন্য উত্তম স্থান হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটিং। ধরুন, আপনি প্রথম আলো বা দ্য গার্ডিয়ান-এ সংবাদ পড়ছেন, এমন সময় কিছু বিজ্ঞাপন আপনার চোখে পড়ছে, যেগুলোর কর্নারে ক্রস চিহ্ন দেয়া থাকে। যা মূলত সার্চ ইঞ্জিন আপনাকে দেখায়। আপনার ব্যবসা যদি বিশ্বব্যাপী অথবা সমগ্র দেশব্যাপী হয়, তাহলে আপনি এই বিজ্ঞাপন ব্যবহার করতে পারেন। কারণ এতে আপনি খুব সাশ্রয়ে বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন। সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন মূলত ট্রাফিক (একটি ওয়েবসাইটের ভিজিটর) নির্ভর। অপরদিকে আপনার যদি কন্টেন্ট থাকে কপি বা নকল ব্যতীত ও নিজস্ব ওয়েবসাইট, তবে আপনি আয় করতে পারবেন সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন থেকে।

সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন গুগলের এডওয়ার্ড’স বা ইয়াহু বিংয়ে সব থেকে বেশি জনপ্রিয়।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং

আপনার ব্যবসা প্রচারের জন্য সব থেকে সহজ ও দ্রুততম গ্রহণযোগ্য মাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ডিজিটাল যুগে ফেসবুক বা টুইটার চালায় না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর। ফেসবুক বা টুইটার ছাড়াও বর্তমানে ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপ চ্যাট, হোয়াটস অ্যাপ বহুল জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এই মাধ্যমে আপনি টাকা দিয়ে বুস্টিং করে অথবা বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে আপনার পণ্যের প্রচারণা চালাতে পারেন। যদি আপনি প্রচণ্ড রকমের স্বদেশী হন তবে আপনার জন্য এই মাধ্যম না। কারণ আপনার দেয়া বিজ্ঞাপনের টাকা দেশ থেকে চলে যাবে যুক্তরাষ্টের হাতে!  

Source: loT For All

কনটেন্ট মার্কেটিং

ক্রেতাকে আকর্ষণ করার জন্য পণ্যের তথ্য সংবলিত লেখা বা ভিডিওকে কনটেন্ট বলা হয়। আর কনটেন্ট মার্কেটিং হচ্ছে এই তথ্যগুলোকে ক্রেতার সামনে তুলে ধরা। বর্তমানে অনেকেই বিজ্ঞাপন দেখতে চান না, তাই তারা অ্যাড ব্লকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করেন। এ সমস্ত গ্রাহকের কাছে যদি আপনার পণ্য বা সার্ভিসের কোনো সুনির্দিষ্ট  তথ্য থাকে, তাহলে আর আপনাকে পায় কে! আপনার পণ্যের ক্রয় করার পাশাপাশি তারা নিজেরাই আপনার প্রমোশন করে দেবে।

এই কনটেন্ট মার্কেটিংয়ের প্লাটফর্ম হতে পারে ভিডিও শেয়ারিং সাইট কিংবা পণ্যের পাশে তথ্য যুক্ত করে দেয়ার মাধ্যমে। যাদের লেখার হাত খুব ভাল তাঁরা বিভিন্ন পণ্যের গুনাগুন লিখে আয় করতে পারবেন। যাদের লেখার হাত ভাল কিন্তু কাজ পাচ্ছেন না তাঁরা ঘুরতে পারেন মার্কেটপ্লেসগুলোতে। ফাইভার.কম, ফ্রিল্যান্সার.কম, আপওয়ার্ক.কম অনলাইন মার্কেট প্লেস।

Source: Career Launcher

অ্যাাফিলিয়েট মার্কেটিং

অন্য কারো পণ্য বা সার্ভিস আপনি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি করাই অ্যাফিলিয়েটিং মার্কেটিং। এতে করে আপনি বিক্রেতার কাছ থেকে পাবেন একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন। যদিও এতে রাতারাতি সাফল্য আসবে না। অল্প সময় দিয়ে টাকা কামানোর চিন্তা করলে এই কাজ আপনার জন্য না। ধৈর্যসহ কাজ করলে সফলতা আসবে নিশ্চিত।  

ই-মেইল মার্কেটিং

আধুনিক যুগের চিঠিপত্র আদান প্রদান করার মাধ্যম হচ্ছে ই-মেইল। আর এই যুগে অধিকাংশ ব্যক্তিরই একের অধিক ই-মেইল থাকে। একটি হয় ব্যক্তিগত মেইল আর অপরটি নির্ধারিত কর্মক্ষত্রের জন্য। আপনি আপনার বিক্রয়যোগ্য পণ্যের গুনাগুণ অথবা পণ্যের সুযোগ-সুবিধা ভোক্তাকে অতি দ্রুতই জানাতে পারবেন। এর জন্য প্রয়োজন কিছু নির্ভুল ই-মেইল। প্রথমে কিছু নির্ভুল মেইল জোগাড় করুন তারপর সংগ্রহকৃত মেইলগুলোতে আপনার পণ্য বা সেবা পাঠিয়ে দিয়ে এক নিমেষেই করে ফেলুন আপনার পণ্য বা সেবার প্রচারণা।   

ইনফ্লুয়েন্স বা প্রভাবিত মার্কেটিং

অনুকরণপ্রিয়তা মানুষের বিশেষত বাঙালির মজ্জাগত অভ্যাস। মাইকেল জ্যাকসনের হেয়ারকাট কিংবা এলভিস প্রিসলির ফ্যাশন স্টাইল সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য। ক্রিকেট তারকা সাকিব আল-হাসান কিংবা বিরাট কোহলি মোবাইল ফোন ব্যবহার করার স্টাইলের পাশাপাশি ব্র্যান্ড সেন্স এক কথায় অনন্য। সাধারণ মানুষ বিশেষত তাঁর কঠিন ভক্তকূল হুবহু একই ফ্যাশন স্টাইল বা পণ্য ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনে জান দিয়ে দেবে। ধরি, আপনার টি-শার্টের ব্যবসা আছে।

আপনাকে শুধু একটু কষ্ট করে আপনার একটি শার্ট কোন বিখ্যাত খেলোয়াড়, অভিনেতা, শিল্পীকে পরিয়ে একটি ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করতে হবে, এরপরের কাজ এ সকল বিখ্যাত ব্যক্তিদের ভক্তকূুল করে দেবে। আর সেটি যদি না পারেন, তবে খুব বেশি পরিমাণ ফলোয়ার সমৃদ্ধ কোনো সাধারণ ব্যক্তিকে পরিয়ে দিয়েও একই কাজ হাসিল করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, একাউন্ট যেন কোনোভাবেই ফেক না হয়।  

মোবাইল মার্কেটিং

Source: Thrive Global

বর্তমান বিশ্বে মোবাইল ফোন চালায় না, এমন মানুষ পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর। বাংলাদেশ সহ ৩য় বিশ্বের দেশগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যপক প্রসারের পূর্বে মোবাইল ফোনই ছিল একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। এতে কথা বলা ছাড়াও ক্ষুদে বার্তা পাঠানো যায় বা গ্রহণ করা যায়। লোকাল ব্যবসায়ীদের জন্য মোবাইল মার্কেটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে, কেননা এর মাধ্যমে আপনি স্বল্প খরচে S.M.S এর মাধ্যমে ভোক্তার কাছে আপনার পণ্যের গুনাগুন তুলে ধরতে, স্পেশাল অফার জানাতে বা নতুন পণ্যের আপডেট জানিয়ে মার্কেটিং করতে পারবেন। যা আপনার বিক্রয়ের মাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।  

ভাইরাল মার্কেটিং

একজন ব্লগারের সব লেখা কি মানুষ পড়ে? অবশ্যই না। যে লেখাটা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক বা কার্যকরী, শুধুমাত্র ঐ লেখাটাই মানুষ পড়ে এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়তে উৎসাহিত করে। পণ্য বা সেবার প্রসারের জন্য মানসম্মত কনটেন্ট লিখে প্রকাশ করতে হবে। এক্ষেত্রে  সমসাময়িক ইস্যুর সাথে মিল রেখে যদি মানসম্মত কনটেন্ট লেখা হয়, তবে আপনার আর কোনো চিন্তা নেই, আপনার কাজ শুধু পণ্য বিক্রি করা। যা করা প্রয়োজন, তা জনগণ করে দেবে।  

Source: Facebook

অফলাইন ডিজিটাল মার্কেটিং

কেউ যদি অনলাইন ডিজিটাল মার্কেটিং এর বাইরেও পণ্যের প্রচার করতে চান, সেক্ষেত্রে তাঁর জন্য অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে অফলাইন ডিজিটাল মার্কেটিং। টেলিভিশন বা রেডিওতে বিজ্ঞাপন এ মাধ্যমের আওতাভুক্ত। যদিও এ বিজ্ঞাপনের খরচ অনেক বেশি হয়ে থাকে। প্রথমাবস্থায়, উদ্যোক্তাদের এ ধরনের বিজ্ঞাপন এড়িয়ে চলাই ভালো।

এতক্ষণ আপনি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানলেন। এবার আপনার গবেষণা করে বের করা উচিত যে, আপনার ব্যবসার জন্য কোনো ধরনের মাধ্যমটি অধিক কার্যকরী। বিপণনের ক্ষেত্রে আপনার লক্ষ রাখা উচিত যে, ক্রেতা বা সেবা গ্রহণকারী যেন আপনার প্রতি আকৃষ্ট হতে বাধ্য হয়। তবেই আপনার উদ্দেশ্য সার্থক হবে।

তথ্যসূত্র-

1. https://ignitevisibility.com/what-is-digital-marketing/
2. https://www.forbes.com/sites/joshsteimle/2014/09/19/what-is-content-marketing/
3. https://www.sparklogix.com/9-types-of-digital-marketing-and-how-to-use-them/

Featured Image: Forbes

Written by Ahmed Jalal

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

স্টার্টআপ বিজনেস শুরু করার আগে জেনে নিন ১০টি আইনী পরামর্শ

প্রতিষ্ঠানের অপ্রত্যাশিত ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলা করবেন কীভাবে?